চ্যানেল ওম নিউজ ডেস্ক
বাংলা শিশুসাহিত্যের কিংবদন্তি ছড়াকার সুকুমার বড়ুয়া আর নেই। শুক্রবার (২ জানুয়ারি) ভোরে চট্টগ্রামের নিজ বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৮ বছর। দীর্ঘদিন ধরে তিনি ডায়াবেটিসসহ নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন। পরিবারের পক্ষ থেকে তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
বাংলা ছড়া ও শিশুসাহিত্যে সুকুমার বড়ুয়ার অবদান অনন্য ও অতুলনীয়। শিশু-কিশোরদের জন্য রচিত তার অসংখ্য জনপ্রিয় ছড়া আজও পাঠকের মুখে মুখে ফেরে। ‘পাগলা ঘোড়া’, ‘ভিজে বেড়াল’, ‘চন্দনা রঞ্জনার ছড়া’ ও ‘কিছু না কিছু’—এই ছড়াগুলো তাকে বাংলা সাহিত্যে এক বিশেষ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে। সাহিত্যক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, বাংলাদেশ শিশু একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারসহ বহু সম্মাননা লাভ করেন। ২০১৭ সালে তাকে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান একুশে পদকে ভূষিত করা হয়।
১৯৩৮ সালের ৫ জানুয়ারি চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার মধ্যম বিনাজুরি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন সুকুমার বড়ুয়া। কর্মজীবনের শুরুতে ষাটের দশকে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী হিসেবে যোগ দেন। পরে স্টোর কিপার হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে ১৯৯৯ সালে অবসর গ্রহণ করেন। ছোট একটি ভাড়া বাসায় বসেই ১৯৬৩ সালে শুরু হয় তার লেখালেখির পথচলা। প্রায় ছয় দশক ধরে ছড়া রচনার মাধ্যমে তিনি বাংলা সাহিত্যে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান গড়ে তোলেন।
ছড়ারাজ, ছড়াশিল্পী ও ছড়াসম্রাট—এই উপাধিগুলোতেই যেন তার সৃজনশীলতার পরিচয় ফুটে ওঠে। তার ছড়ায় ব্যঙ্গ ও হাস্যরসের পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষা, সামাজিক বাস্তবতা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং রাজনৈতিক সচেতনতার প্রতিফলন স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
তার প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য ছড়ার বইয়ের মধ্যে রয়েছে—‘এলোপাতাড়ি’, ‘নানা রঙের দিন’, ‘চিচিং ফাঁক’, ‘প্রিয় ছড়া শতক’, ‘নদীর খেলা’, ‘ছোটদের হাট’, ‘মজার পড়া ১০০ ছড়া’, ‘যুক্তবর্ণ’, ‘চন্দনার পাঠশালা’ ও ‘জীবনের ভেতরে বাইরে’।
তার মেয়ে অঞ্জনা বড়ুয়া গণমাধ্যমকে জানান, গত এক সপ্তাহ ধরে তার বাবা চট্টগ্রামের একটি মেডিকেল সেন্টারে চিকিৎসাধীন ছিলেন। শুক্রবার তাকে জে কে মেমোরিয়াল হাসপাতালে নেওয়া হলে জানা যায়, তার ফুসফুসে পানি জমে গিয়েছিল। চিকিৎসকেরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালালেও শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
একুশে পদক ছাড়াও বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, আলাওল সাহিত্য পুরস্কার, চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব সম্মাননা, অবসর সাহিত্য পুরস্কার, আনন ফাউন্ডেশন আজীবন সম্মাননা ও চন্দ্রাবতী শিশুসাহিত্য পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন সুকুমার বড়ুয়া।
বাংলা ছড়াশিল্পের এই অমর মুকুটধারীর সাহিত্যকর্ম ও শিশুসাহিত্যে অবদান চিরকাল স্মরণে রাখবে বাংলা ভাষাভাষী পাঠকসমাজ।