সীতাকুণ্ড প্রতিনিধি
প্রায় তিন শতাব্দী আগে চট্টগ্রাম নগরী থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে সীতাকুণ্ড উপজেলা-র চন্দ্রনাথ পাহাড় চূড়ায় শুরু হয় শিব চতুর্দশী মেলার প্রচলন। সেই ঐতিহ্য আজও অব্যাহত। প্রতি বছর ফাল্গুন মাসে তিন দিনব্যাপী এ মেলায় ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে লাখো সনাতন ধর্মাবলম্বী সমবেত হন।
হিন্দু শাস্ত্রীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, মহাদেবের বাণী—“কলিকালে আমি চন্দ্রনাথ চন্দ্রশিখরে অবস্থান করিব।” আরও বলা হয়েছে, “এই তীর্থ যিনি দর্শন করিবেন, তার পুনর্জন্ম হইবে না; তিনি স্বর্গবাসী হইবেন।” এই আস্থাকে হৃদয়ে ধারণ করেই জীবনে অন্তত একবার এই মহাতীর্থ দর্শনের উদ্দেশ্যে ভক্তরা ছুটে আসেন চন্দ্রনাথে।
মেলাকে ঘিরে প্রাণচাঞ্চল্যে ভরে ওঠে পুরো এলাকা। স্থানীয়দের ব্যবসা-বাণিজ্য জমে ওঠে এ সময়। সারা বছর পাহাড়ে বাগান পরিচর্যা করা মানুষরাই মেলার সময়ে নানা পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেন। এতে যেমন তাদের বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি হয়, তেমনি তীর্থযাত্রীরাও প্রয়োজনীয় সামগ্রী ও দিকনির্দেশনা সহজে পান।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সীতাকুণ্ডের কলেজ রোড থেকে দুই নম্বর পুল পর্যন্ত প্রায় আড়াই কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বসেছে প্রায় হাজারখানেক দোকান। দুই নম্বর পুল পেরোলেই শুরু হয় খাড়া ও আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ। প্রায় ১২০০ ফুট উচ্চতার চূড়ায় অবস্থিত শিবমন্দিরে পৌঁছাতে ঝুঁকি নিয়েই লাঠি হাতে এগিয়ে যান তীর্থযাত্রীরা। অনেকেই মাঝপথে বিশ্রাম নেন, তবে লক্ষ্য একটাই—শিবলিঙ্গে ডাবের পানি ঢেলে পূজা সম্পন্ন করা।
পাহাড়ি সরু পথের দুই পাশে সারি সারি দোকান। হোটেল-রেস্তোরাঁ ছাড়াও বিক্রি হচ্ছে ডাব, পাহাড়ি বেল ও বেলের শরবত, তেঁতুল, পানি, সীতার সুপারি, নাগলতা, মোমবাতি, আগরবাতি, কলা, সিন্দুর, শাঁখা, তবলা, ঢোল, গীতা ও ধর্মীয় বইসহ পূজার নানা উপকরণ। তবে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে পাহাড়ি লাঠি।
স্থানীয়দের ভাষ্য, বহু বছর ধরে পাহাড় থেকে বিশেষ ধরনের লাঠি সংগ্রহ করা হয়। শিব চতুর্দশী মেলাকে কেন্দ্র করে তিন মাস আগে থেকেই লাঠি সংগ্রহ শুরু হয়। পরে সেগুলো পানিতে ভিজিয়ে, আগুনে পুড়িয়ে ও হলুদ মেখে নকশা করা হয়। দুই নম্বর পুলের পূর্ব পাশে বসা প্রতিটি লাঠির দোকানে ৩-৪ জন কর্মী কাজ করেন। পাহাড়ে ওঠার জন্য লাঠি বেশ সহায়ক হওয়ায় অধিকাংশ তীর্থযাত্রী একটি করে লাঠি কিনে নেন।
হবিগঞ্জ থেকে আসা সুনন্দ দাস জানান, তিনি ১০০ টাকায় একটি মজবুত ও আকর্ষণীয় লাঠি কিনেছেন। কুমিল্লার লক্ষী রাণী দাস বলেন, বয়স ৫০ পেরিয়েছে; লাঠি থাকলে চন্দ্রনাথে উঠতে সুবিধা হয় এবং এটি তাদের ভরসা জোগায়।
এক লাঠি বিক্রেতা জানান, লাঠি বিক্রির ঐতিহ্য থেকেই তাদের এলাকার নাম হয়েছে ‘লাঠিয়াল পাড়া’। পাহাড় থেকে সংগৃহীত কাঁচা লাঠিকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় প্রস্তুত করা হয়। অনেক ভক্ত পূজা শেষে স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে এসব লাঠি বাড়িতে নিয়ে যান। পাশাপাশি সীতার সুপারি ও নাগলতাও কেনেন অনেকে।
তবে দুর্গম এ পাহাড়ে ঝুঁকিও কম নয়। প্রতিবছরই কেউ না কেউ অসুস্থ বা আহত হন। রবিবার পাহাড়ে ওঠার সময় এক নারী, এক পুরুষ ও এক কিশোরীসহ তিনজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও মেলা কমিটির নির্বাহী সভাপতি মো. ফখরুল ইসলাম জানান, সীতাকুণ্ড শ্রাইন কমিটি ধর্মীয় আয়োজন সম্পন্ন করেছে। নিরাপত্তা নিশ্চিতে পুলিশ ও সেনাবাহিনী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছে। এবারের মেলা শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদভাবে সম্পন্ন হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
Create a Social Card
Convert this news into a shareable image card instantly.