অংকন ধর
বাংলার শাক্ত ধর্মপরম্পরায় দেবী জগদ্ধাত্রী এক মহাশক্তির প্রতীক। দুর্গা, কালী, লক্ষ্মী ও সরস্বতীর পর তিনিই সেই শান্ত, ধ্যানমগ্ন ও জ্ঞানময় রূপ, যিনি জগৎকে ধারণ করেন— তাই তাঁর নাম “জগদ্ধাত্রী”। কার্তিক মাসের শুক্লা নবমীতে পালিত হয় তাঁর পূজা, যা আত্মনিয়ন্ত্রণ, ধৈর্য ও ভক্তির প্রতীক।

চণ্ডীতে বলা হয়েছে—

“যা দেবী সর্বভূতেষু শক্তিরূপেণ সংস্থিতা,
নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ।”
অর্থাৎ, যিনি সকল জীবের মধ্যে শক্তিরূপে বিরাজমান, তাঁকেই বারংবার প্রণাম।
এই শ্লোকেই জগদ্ধাত্রী মায়ের তত্ত্ব নিহিত— তিনি প্রতিটি প্রাণে, প্রতিটি কর্মে, প্রতিটি নিঃশ্বাসে শক্তি হয়ে বিরাজ করেন।



শাস্ত্রে বলা আছে, “যত্র বিশ্বং ভরত্যেবা সা ধাত্রী পরমা মতা”— যিনি বিশ্বকে ধারণ করেন তিনিই জগদ্ধাত্রী। তাঁর চার হাতে শঙ্খ, চক্র, ধনুক ও তীর। শঙ্খ পবিত্রতার প্রতীক, চক্র ন্যায়ের, ধনুক ও তীর শক্তি ও সংযমের প্রতীক। তিনি সিংহে আরোহিনী, অহংকার ও ক্রোধের দমনকারিণী। তাঁর পদতলে পরাভূত অসুর— মানুষের অন্তরের লোভ, ক্রোধ ও হিংসার প্রতিচ্ছবি।

পুরাণে আছে, এক সময় দেবতারা নিজেদের গৌরবে ভরপুর হয়ে অহংকারে অন্ধ হয়ে উঠেছিলেন। তখন মহাশক্তি জগদ্ধাত্রী রূপে আবির্ভূত হয়ে তাঁদের শিক্ষা দেন— “শক্তি কখনও স্বার্থে নয়, তা জগৎধারণের জন্য।” এই তত্ত্বই আজও আমাদের শেখায়— নিজের শক্তি যেন মানবতার সেবায় ব্যয় হয়, নয়তো তা হয়ে ওঠে ধ্বংসের কারণ।

চণ্ডীর আরেক স্থানে দেবী বলেন—

> “অহং স্বভাবা ধ্যানত্মিকা, বিশুদ্ধা চ নিত্যদা।”
অর্থাৎ, আমি সেই স্বভাবতঃ ধ্যানময় চেতনা, যিনি সর্বদা বিশুদ্ধ ও নিত্য।
এই ধ্যানময় রূপই জগদ্ধাত্রী— যিনি শক্তিকে শান্তির মধ্য দিয়ে প্রকাশ করেন।



কার্তিক মাসের নির্মল আকাশ, শীতের হালকা ছোঁয়া, বাতাসে ধূপের গন্ধ— এই সময় বাংলার ঘরে ঘরে জগদ্ধাত্রী মায়ের পূজা হয়। দুর্গাপূজা ও দীপাবলির পর এই পূজা যেন ভক্তির শেষ সোপান, যেখানে মানুষ বাহ্যিক জাঁকজমক নয়, অন্তরের শান্তি খোঁজে। প্রতিমার মুখে প্রশান্ত হাসি, চোখে করুণা, রঙে লাল, সাদা ও সোনালি মিশ্রণে ধ্যানের আভা। পূজার মূল মন্ত্র—

> “ওঁ জগদ্ধাত্র্যৈ নমঃ।”



ভক্তরা ধূপ, দীপ, ফুল, চন্দন, বেলপাতা ও ফলমূল নিবেদন করে মায়ের আহ্বান জানান। ঘরে বাজে ঢাক, উলুধ্বনি, শঙ্খধ্বনি— পরিবেশ ভরে ওঠে এক পবিত্র আভায়।

বাংলার ঐতিহ্যে এই পূজা কেবল ধর্মীয় নয়, সাংস্কৃতিক উৎসবও বটে। গ্রাম থেকে শহর— সর্বত্র মানুষ মিলিত হয় এক আত্মিক বন্ধনে। প্রতিমা, সঙ্গীত, আলো, নৃত্য ও ভক্তির মিলনে সৃষ্টি হয় অনুপম আবহ। মা যেন সমাজকে শেখান— একতার মধ্যেই শক্তি, সহযোগিতাতেই শান্তি।

চণ্ডীতে দেবীর স্তবনায় বলা হয়েছে—

> “শান্তিরূপা জগত্‌স্রষ্ট্রি, রক্ষিণী সংহারিণী চ।”
অর্থাৎ, যিনি শান্তির রূপে জগৎ সৃষ্টি করেন, রক্ষা করেন ও প্রয়োজনে ধ্বংস করেন— তিনিই সর্বময়ী শক্তি।
জগদ্ধাত্রী মায়ের আরাধনা সেই শান্তির রূপকেই স্মরণ করায়, যেখানে শক্তি মানে ধ্বংস নয়, রক্ষা ও স্থিতি।



আজকের সমাজে যখন হিংসা, লোভ ও বিভাজন ছড়িয়ে পড়ছে, তখন জগদ্ধাত্রী পূজার বার্তা আরও প্রাসঙ্গিক। মা যেন আমাদের মনে করিয়ে দেন— “ধারণ করো, ধ্বংস নয়; রক্ষা করো, বিভাজন নয়।” যুবসমাজের প্রতি তাঁর আহ্বান— জ্ঞান, সংযম ও ভক্তিতে শক্তিশালী হও; সততা ও করুণায় সমাজকে আলোকিত করো।

জগদ্ধাত্রী মায়ের পূজা তাই শুধু ধর্মীয় নয়, মানবিক ও নৈতিক শক্তির উৎস। তিনি আমাদের অন্তরে জ্বালিয়ে দেন শান্তির দীপ, সংযমের জ্যোতি, ভক্তির আলো। তাঁর কৃপায় মানুষ শিখে যায়— অহংকার পরিত্যাগ করে কীভাবে আত্মার দীপ্তি অর্জন করা যায়।

চণ্ডীর মহিমা স্মরণে বলা যায়—

“যা দেবী সর্বভূতেষু মাতৃরূপেণ সংস্থিতা,
নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ।”


মা জগদ্ধাত্রী সেই মহাশক্তি, যিনি প্রতিটি হৃদয়ে মাতৃত্বের করুণা, শক্তি ও ধৈর্যের বীজ রোপণ করেন। তিনি আমাদের শিখিয়ে দেন— শান্তিই প্রকৃত জয়, সংযমই সত্য শক্তি, আর ভক্তিই পরম মুক্তি।

ওঁ জগদ্ধাত্র্যৈ নমঃ। জয় মা জগদ্ধাত্রী।
মা সবার মঙ্গল করুক।