চ্যানেল ওম নিউজ ডেস্ক

বাবা-মায়ের দীর্ঘ অপেক্ষা ও শত সাধনার পর পৃথিবীতে এসেছিলেন রিয়া মজুমদার। চলতি মাসে প্রকাশিত এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে সব বিষয়ে এ প্লাস পেয়ে অর্জন করেছিলেন জিপিএ-৫। একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির প্রস্তুতি নিয়ে নতুন স্বপ্নে এগোচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু কয়েক দিনের ডেঙ্গু জ্বরে শনিবার (২৯ আগস্ট) মাত্র ১৬ বছর বয়সেই থেমে গেল সেই স্বপ্নযাত্রা।

রিয়ার বাড়ি খুলনা বিভাগের বাগেরহাট জেলার সাহসপুর গ্রামে। শিক্ষক দম্পতি দিবস মজুমদার ও রমা রাণীর দুই মেয়ের মধ্যে রিয়া ছিলেন বড়। তার ছোট একটি বোন রয়েছে। বাবা-মা দুজনই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং বাড়ির পাশের সাহসপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত।

এসএসসি পরীক্ষায় সব বিষয়ে এ প্লাস পাওয়ার পর একাদশ শ্রেণিতে পড়াশোনার প্রস্তুতি নিতে খুলনা শহরে একটি মেসে ওঠেন রিয়া। সেখানে থাকার সময়ই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন তিনি।

রিয়ার স্কুলের শিক্ষক কৃষ্ণপদ বিশ্বাস জানান, রিয়াসহ মেসে থাকা তিন বান্ধবী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন। রিয়ার সঙ্গে দেখা করতে যাওয়া তার বাবারও ডেঙ্গু ধরা পড়ে। অন্যরা সুস্থ হয়ে উঠলেও রিয়াকে আর বাঁচানো যায়নি।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, বুধবার ডেঙ্গু পরীক্ষায় রিয়ার ফল পজিটিভ আসে। সেদিন তার প্লাটিলেট ছিল ১ লাখ ৭৪ হাজার। তবে এর কয়েক দিন আগেই তার জ্বর শুরু হয়েছিল। বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার তার প্লাটিলেট পরীক্ষা করা হয়েছিল কি না, তা জানা যায়নি।

খুলনায় ডেঙ্গু শনাক্ত হওয়ার পর রিয়াকে বাগেরহাটে নিয়ে আসেন তার বাবা-মা। পুরাতন রেলরোড এলাকার পাশে চাচার বাসায় রেখে তার চিকিৎসা চলছিল। একই চিকিৎসকের কাছ থেকে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হন রিয়ার বাবা।

শিক্ষক কৃষ্ণপদ বিশ্বাস বলেন, রিয়ার বাবা-মা বর্তমানে শোকে স্তব্ধ হয়ে আছেন। শুক্রবার দুপুরেও রিয়া হাসিখুশি ছিল। বিকেলে হঠাৎ খিঁচুনি শুরু হলে তাকে খুলনায় নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।

তিনি আরও বলেন, রিয়ার মতো মেধাবী শিক্ষার্থী তার চাকরিজীবনে খুব কমই পেয়েছেন। তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর আশপাশের কয়েকটি গ্রামে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

ছোটবেলা থেকেই মেধাবী রিয়া পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সহশিক্ষা কার্যক্রমেও ছিল সক্রিয়। স্কুলের সর্বশেষ বিতর্ক প্রতিযোগিতায় সে সেরা বিতার্কিকের পুরস্কার পেয়েছিল। বার্ষিক ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নাচ, গান, কবিতা, উপস্থিত বক্তৃতা ও বিতর্ক—সবগুলো ইভেন্টেই প্রথম স্থান অর্জন করেছিল সে।

রিয়ার এক সহপাঠী জানান, গ্রাম থেকে খুলনা শহরে গিয়ে কলেজে পড়ার স্বপ্নে বিভোর ছিল রিয়া। কোন কলেজে ভর্তি হবে, কোথায় থাকবে—এসব নিয়েও আগেভাগেই পরিকল্পনা করছিল।

স্থানীয়দের অভিযোগ, এ বছর খুলনা শহরে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়েছে। তবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্থানীয় প্রশাসনের তেমন কোনো কার্যকর নজরদারি নেই।

রিয়ার বাবা দিবস মজুমদার ও মা রমা রাণীর দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পর জন্ম হয়েছিল তার। তারুণ্যের ভালোবাসার পর প্রতিষ্ঠিত হয়ে সংসার শুরু করা এই শিক্ষক দম্পতি রিয়ার জন্মের জন্য বাংলাদেশ ও ভারতে চিকিৎসা নিয়েছিলেন। অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে পৃথিবীতে আসা সেই রিয়াই এসএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়ার পর নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখছিল। কিন্তু ডেঙ্গুতে আকস্মিক মৃত্যুতে তার সব স্বপ্নই আজ থেমে গেল।