যীশু সেন

শিল্প, সাহিত্য, সংগীত ও নৃত্যের অনন্য সমন্বয়ে মানবজীবনের আত্মজাগরণ, অনুশোচনা ও রূপান্তরের শাশ্বত বার্তা ছড়িয়ে দিলেন কোয়েপাড়া পল্লী সেবা সংঘের শিল্পীরা। বিজয়া দশমীর আবহে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালজয়ী গীতিনাট্য ‘বাল্মীকি প্রতিভা’র গীতিনৃত্যালেখ্য মঞ্চায়নের মধ্য দিয়ে রাউজানের কোয়েপাড়ায় সৃষ্টি হয় এক মনোমুগ্ধকর সাংস্কৃতিক আবহ। পৌরাণিক আখ্যানের অন্তরালে মানবিক মূল্যবোধের জাগরণ, হিংসা থেকে করুণায় উত্তরণ এবং অন্ধকার থেকে আলোর পথে এগিয়ে যাওয়ার চিরন্তন দর্শন দর্শকদের সামনে জীবন্ত হয়ে ওঠে।
গত ২১ অক্টোবর বুধবার রাতে রাউজানের কোয়েপাড়া পল্লী সেবা সংঘের মাঠ প্রাঙ্গণে কোয়েপাড়া সর্বজনীন শারদীয় দুর্গোৎসব উদযাপন পরিষদের আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয় আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের এই বিশেষ পর্ব। অনুষ্ঠানের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বাল্মীকি প্রতিভা’র গীতিনৃত্যালেখ্য মঞ্চায়ন। শিল্পীদের অভিনয়, নৃত্য, সংগীত, পোশাক পরিকল্পনা ও মঞ্চ-উপস্থাপনার সমন্বয়ে পরিবেশনাটি দর্শকদের কাছে হয়ে ওঠে উপভোগ্য ও তাৎপর্যপূর্ণ।
রত্নাকর থেকে মহর্ষি বাল্মীকি: আত্মজাগরণের চিরন্তন আখ্যান মানুষ কি সত্যিই বদলে যেতে পারে? অপরাধ ও হিংসায় নিমজ্জিত জীবন থেকেও কি জেগে উঠতে পারে বিবেক, করুণা ও সৃষ্টিশীলতার আলো? ভারতীয় পৌরাণিক ঐতিহ্যে দস্যু রত্নাকর থেকে মহর্ষি বাল্মীকি হয়ে ওঠার কাহিনি এই প্রশ্নগুলোরই গভীর তাৎপর্যপূর্ণ উত্তর বহন করে।
লোকপ্রচলিত আখ্যান অনুযায়ী, ঋষি নারদের একটি প্রশ্ন রত্নাকরের জীবনবোধে গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করে। আত্মোপলব্ধি ও অনুশোচনার মধ্য দিয়ে তাঁর জীবনে শুরু হয় পরিবর্তনের এক দীর্ঘ অভিযাত্রা। পরবর্তী সময়ে মহর্ষি বাল্মীকি হিসেবে তিনি ভারতীয় সাহিত্যের অমর মহাকাব্য রামায়ণ-এর রচয়িতা হিসেবে স্মরণীয় হয়ে ওঠেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর প্রারম্ভিক গীতিনাট্য ‘বাল্মীকি প্রতিভা’য় এই রূপান্তরের ভাবনাকে শিল্পিত রূপ দিয়েছেন। দস্যু রত্নাকরের অন্তরে কবিত্ব ও সৌন্দর্যবোধের জাগরণ, দেবী সরস্বতীর কৃপায় সৃষ্টিশীল সত্তার উন্মেষ এবং নিষ্ঠুরতা থেকে মানবিকতায় উত্তরণের অনন্য প্রকাশ ঘটেছে এই গীতিনাট্যে। এখানে শিল্প কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়; শিল্প মানুষের অন্তর্লোককে আলোকিত করারও শক্তিশালী উপায়। কোয়েপাড়ার মঞ্চে ‘বাল্মীকি প্রতিভা’র পরিবেশনা তাই নিছক একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছিল না; বরং তা হয়ে উঠেছিল আত্মশুদ্ধি, মানবিকতা ও ইতিবাচক পরিবর্তনের এক নান্দনিক বার্তা। বর্তমান সমাজে যখন বিদ্বেষ, অসহিষ্ণুতা ও আত্মকেন্দ্রিকতার নানা প্রকাশ চোখে পড়ে, তখন এ ধরনের শিল্পায়োজন মানুষকে বিবেক, সহমর্মিতা ও সৌন্দর্যবোধের চর্চায় উদ্বুদ্ধ করতে পারে। শিল্পীদের সম্মিলিত প্রয়াসে বর্ণময় মঞ্চায়ন গীতিনৃত্যালেখ্যটির মূল পরিকল্পনা ও সার্বিক নির্দেশনায় ছিলেন শোভন সেন গুপ্ত এবং পরিচালনায় ছিলেন অসিত নন্দী। প্রধান চরিত্রে বাল্মীকি হিসেবে উজ্জ্বল তালুকদার, বালিকার ভূমিকায় আদৃতা নন্দী, মা কালীর ভূমিকায় বৃন্দা দে, মা সরস্বতীর ভূমিকায় বর্ষা ঘোষ এবং মা লক্ষ্মীর ভূমিকায় তিলোত্তমা সেন গুপ্ত অভিনয় করেন। অতিথি শিল্পী হিসেবে দস্যু সর্দারের চরিত্রে অভিনয় করেন ইন্দ্রজিৎ ভট্টাচার্য। দস্যু ও শিকারীদলের চরিত্রে অভিনয় করেন স্বাগত, সৌম্য, শাশ্বত, সৌম্যদীপ, ইন্দ্রনীল, শ্রাবণ, দিব্য, দুর্জয়, শান্তনু ও অরিন্দম। ছোট পাখির ভূমিকায় ছিল সৃজা, আরোহী, হৃদিতা ও সপ্তর্ষি। হরিণশাবকের চরিত্রে অভিনয় করে প্রিজয় ও অনুপম। পল্লীকন্যার ভূমিকায় ছিলেন নীলাদ্রি, তৃষাম, আনুষ্কা, অনন্যা, সায়ন্তিকা, আদ্রিকা, পুষ্পা ও অন্বি। বনদেবীর চরিত্রে অংশ নেন পৌষালী, আবৃতি, প্রথা, মাত্রা, মিঠি, মুনা, সুকন্যা, শ্রুতি, বৈশাখী ও জয়শ্রী। গ্রামবাসীর ভূমিকায় অভিনয় করেন সুমি বৈদ্য, সোমা বিশ্বাস, প্রীতি দেব ও মনিকা দাশ গুপ্ত। ব্রাহ্মণ দম্পতির চরিত্রে ছিলেন পিকলু চক্রবর্ত্তী ও শুকলা আচার্য্য। নৃত্য পরিচালনায় দায়িত্ব পালন করেন বর্ষা ঘোষ, তিলোত্তমা সেন গুপ্ত ও সুমি বৈদ্য। তাঁদের পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় গীতিনাট্যের বিভিন্ন পর্বে নৃত্যের প্রকাশ পরিবেশনাকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। ভিডিওগ্রাফি ও ধারাবর্ণনায় ছিলেন শুভার্থী সেনগুপ্ত। মেকআপ আর্টিস্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মো. সেলিম। সার্বিক সহযোগিতায় ছিলেন সাধন দেব, রূপক বিশ্বাস, সনজিত নন্দী, রাসেল দেব, পূজার সভাপতি সৌমেন দেব, সাধারণ সম্পাদক সৌরভ দেবরায়, রবি বিশ্বাস, শুকলা আচার্য্য, শিবানী চক্রবর্ত্তী, মুক্তা তালুকদার, সংগীতা বিশ্বাস, প্রবীর দে, জুয়েল দেবরায়, জয় চৌধুরী ও আদর চক্রবর্ত্তী। তাঁদের সম্মিলিত সহযোগিতা আয়োজনটিকে সফলভাবে মঞ্চস্থ করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বিজয়া দশমীর আবেগ, ঐতিহ্য ও সম্প্রীতির বন্ধন। দুর্গোৎসবের শেষ পর্ব বিজয়া দশমী বাঙালির জীবনে একই সঙ্গে আনন্দ, আবেগ ও বিদায়ের দিন। দেবী দুর্গার বিদায়বেলায় ভক্তির অশ্রু, শুভেচ্ছা বিনিময় এবং পারস্পরিক সৌহার্দ্যের মধ্য দিয়ে উৎসবের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে। কোয়েপাড়াতেও বিজয়া দশমীর বিকেলে দেবীকে তেল-সিঁদুর নিবেদন, বিসর্জন এবং ভক্তদের পায়েস-অন্ন পরিবেশনের মধ্য দিয়ে পালিত হয় বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা। আলোচনা সভায় শুভাশীষ চক্রবর্ত্তীর সঞ্চালনায় স্থানীয় বিএনপির নেতৃবৃন্দ ও রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ অংশ নেন। উৎসবের ধর্মীয় অনুষঙ্গের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক পরিবেশনা স্থানীয় মানুষের মধ্যে মিলন, সম্প্রীতি ও সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করার সুযোগ সৃষ্টি করে। উল্লেখ্য, কোয়েপাড়া সর্বজনীন শারদীয় দুর্গাপূজা ১৬ থেকে ২০ অক্টোবর পর্যন্ত পূজা-অর্চনা, ভোগ নিবেদন, আরতি, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ঢাকের তালে আরতি, প্রসাদ বিতরণ ও মায়ের চরণে পুষ্পাঞ্জলিসহ নানা মাঙ্গলিক আয়োজনের মধ্য দিয়ে উদ্‌যাপিত হয়। সপ্তমীতেই অনুষ্ঠিত হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের একটি পর্ব। আর বিজয়া দশমীর বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে মঞ্চস্থ হয় ‘বাল্মীকি প্রতিভা’র গীতিনৃত্যালেখ্য। সংস্কৃতিচর্চায় নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণ। এ আয়োজনের বিশেষ তাৎপর্য শিশু-কিশোর ও তরুণ শিল্পীদের অংশগ্রহণ। বিভিন্ন বয়সের শিল্পীদের সংগীত, নৃত্য ও অভিনয়ের সমন্বয়ে একটি সাহিত্যনির্ভর গীতিনাট্যে যুক্ত করতে প্রয়োজন দীর্ঘ প্রস্তুতি, নিবিড় অনুশীলন ও সম্মিলিত দায়িত্ববোধ। অন্ধকার যত গভীরই হোক, আলোর সম্ভাবনা কখনো নিঃশেষ হয় না। রবীন্দ্রনাথের ‘বাল্মীকি প্রতিভা’র এই শাশ্বত বাণীকে ধারণ করে কোয়েপাড়ার মঞ্চে শিল্পীরা যে সৃজনশীল প্রয়াস উপস্থাপন করেছেন, তা স্থানীয় সাংস্কৃতিক চর্চায় স্মরণীয় সংযোজন হয়ে থাকবে—এমন প্রত্যাশাই সংশ্লিষ্ট সবার।